প্রকাশ: · পড়তে ~৬ মিনিট
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বড় অংশই যান সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন — মোট বিদেশগামীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, আর একক কোনো দেশে এক বছরে এটাই সর্বোচ্চ। চাহিদা বেশি, কিন্তু ভুল ভিসা বা ভুল দালালের কারণে ক্ষতিও এখানে সবচেয়ে বেশি হয়। নিচে সৌদি কাজের ভিসার আসল প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে।
সংক্ষেপে: নিয়োগকর্তা ভিসা দেন → মেডিকেল (Wafid) → স্কিল সার্টিফিকেট (Takamol, $৫০) → Tasheer কেন্দ্রে আঙুলের ছাপ ও ভিসা স্ট্যাম্প → BMET ছাড়পত্র (oep.gov.bd) → ফ্লাইট → সৌদিতে পৌঁছে ইকামা। সৌদি আইনে রিক্রুটমেন্ট ফি, ইকামা আর ওয়ার্ক পারমিটের খরচ নিয়োগকর্তার।
ভিসার ধরন
- কোম্পানি বা গ্রুপ ভিসা: একই কোম্পানিতে অনেক কর্মী যান। নিয়োগকর্তা সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের Qiwa প্ল্যাটফর্মে কোটা নিয়ে ভিসা ইস্যু করেন। ২৫ জনের বেশি কর্মী এক কোম্পানিতে গেলে সেটাকে গ্রুপ ভিসা ধরা হয়।
- একক (সিঙ্গেল) ভিসা: একজন বা অল্প কয়েকজনের জন্য আলাদা ভিসা। এখানেই প্রতারণা বেশি — অনেকে গিয়ে দেখেন ভিসার কোম্পানির কোনো কাজ নেই।
- গৃহকর্মী ভিসা (হাউস ড্রাইভারসহ): নিয়োগকর্তা Musaned প্ল্যাটফর্মে আবেদন করেন, সেখান থেকেই ই-চুক্তি তৈরি হয়। গৃহকর্মীরা সাধারণ শ্রম আইনের বদলে আলাদা বিধিমালার আওতায় পড়েন।
“ফ্রি ভিসা” নামে কোনো বৈধ ভিসা নেই। যে ভিসায় বলা হয় “গিয়ে নিজে কাজ খুঁজে নেবেন”, সেটা সাধারণত অন্য কোম্পানির নামে নেওয়া ভিসা — সৌদিতে সেই কোম্পানির বাইরে কাজ করা অবৈধ, ধরা পড়লে জরিমানা ও দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
ইকামা কী, খরচ কার
ইকামা হলো সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া আবাসিক পরিচয়পত্র — এটা ছাড়া সৌদিতে বৈধভাবে থাকা ও কাজ করা যায় না। ইকামা নিয়োগকর্তার সাথে যুক্ত, প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়।
সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই খরচগুলো নিয়োগকর্তার:
- রিক্রুটমেন্ট ফি
- ইকামা ফি ও নবায়ন
- ওয়ার্ক পারমিট ফি ও নবায়ন, দেরির জরিমানা
- পেশা পরিবর্তনের ফি আর এক্সিট/রি-এন্ট্রি ফি
- চুক্তি শেষে দেশে ফেরার টিকিট
তাই কেউ যদি বলে “ইকামার টাকা আপনাকে দিতে হবে” — সেটা সৌদি আইনের সাথে মেলে না। এ নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন: সৌদিতে শ্রমিকের অধিকার।
বাংলাদেশ থেকে ধাপে ধাপে
- চাকরির অফার ও ভিসা: নিয়োগকর্তা Qiwa (কোম্পানি) বা Musaned (গৃহকর্মী)-এ ভিসা ইস্যু করেন। বাংলাদেশে BMET-লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি কাজটা এগিয়ে নেয়। এজেন্সির লাইসেন্স OEP-এর RAIMS তালিকায় “Active” কিনা আগে দেখুন।
- মেডিকেল (Wafid): উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা হয়, Wafid (আগে GAMCA) সিস্টেমে সেন্টার বরাদ্দ হয়। সরকার-নির্ধারিত খরচ প্রায় ৳১০,০০০ (সাথে Wafid-এর $১০ রেজিস্ট্রেশন)। “ফিট রিপোর্ট নিশ্চিত” বলে ৳২০–৩০ হাজার বা তার বেশি চাইলে সেটা সিন্ডিকেটের দাবি।
- স্কিল সার্টিফিকেট (Takamol / Skill Verification Program): ১৯ জুন ২০২৫ থেকে এই সার্টিফিকেট ছাড়া সৌদি দূতাবাস কাজের ভিসা দেয় না — গৃহকর্মী ছাড়া প্রায় সব পেশায়, এমনকি ক্লিনার আর লোডিং-আনলোডিং কর্মীদেরও। ফি $৫০, ফেল করলে আবার $৫০। সার্টিফিকেট ৫ বছর বৈধ। পরীক্ষা হয় Takamol-অনুমোদিত কেন্দ্রে (মূলত সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা TTC); ২০২৫ সালে এমন কেন্দ্র ছিল ২৮টি।
- আঙুলের ছাপ ও ভিসা স্ট্যাম্প (Tasheer): অক্টোবর ২০২৩ থেকে কাজের ভিসায় বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক। ঢাকায় যমুনা ফিউচার পার্ক আর চট্টগ্রামে Tasheer কেন্দ্র আছে; অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয় vc.tasheer.com থেকে।
- দূতাবাসের সত্যায়ন (প্রযোজ্য হলে): গ্রুপ ভিসার কাগজ আগে থেকেই রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং যাচাই করে। জানুয়ারি ২০২৫-এ একক ভিসার জন্যও সত্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, পরে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়। এখন আপনার ভিসায় কী লাগে তা BMET বা ১৬১৩৫-এ জেনে নিন।
- BMET ছাড়পত্র: oep.gov.bd-তে নিবন্ধন (৳২০০), ৩ দিনের প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ, আঙুলের ছাপ, কল্যাণ ফি (৳৫,৫০০) আর বিমা (৳১,০০০) — তারপর QR কোডসহ স্মার্ট কার্ড। বিস্তারিত: BMET স্মার্ট কার্ড কীভাবে করবেন।
- সৌদিতে পৌঁছে: নিয়োগকর্তা ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিটের কাজ শুরু করেন — সাধারণত পৌঁছানোর ৯০ দিনের মধ্যে। ইকামা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পাসপোর্ট, ভিসা আর চুক্তির কপি সাথে রাখুন।
সৌদি সরকার জুন ২০২৬-এ জানিয়েছে: যাঁদের ওয়ার্ক পারমিট ১২ মাসের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ, বা পৌঁছানো/নিয়োগকর্তা বদলের ৬ মাস পরও পারমিট নেই — তাঁদের ২০২৬ সালের মধ্যে বিষয়টা ঠিক করতে হবে, নইলে আইনি ব্যবস্থা। আপনার পারমিট ঠিক আছে কিনা নিয়োগকর্তার কাছে নিশ্চিত হোন।
ভিসা আর চুক্তি নিজে যাচাই করুন
- ভিসা: সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল visa.mofa.gov.sa-তে “Inquiry” অংশে ভিসা বা আবেদন নম্বর দিয়ে দেখা যায় ভিসাটা আসল কিনা, কোন কোম্পানির নামে, কোন পেশায়।
- পেশা মিলিয়ে দেখুন: ভিসায় লেখা পেশা আর আপনাকে যে কাজের কথা বলা হচ্ছে তা এক কিনা। “ক্লিনার” ভিসায় “ড্রাইভারের চাকরি” প্রতিশ্রুতি একটা লাল সংকেত।
- কোম্পানি চুক্তি: বেসরকারি খাতের চুক্তি Qiwa-তে নথিভুক্ত হয় এবং বিচার মন্ত্রণালয়ের Najiz সিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকে — ফলে চুক্তিটা আদালতে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য। পৌঁছানোর পর Qiwa অ্যাকাউন্টে নিজের চুক্তি দেখে নিন।
- লিখিত চুক্তি নিন: যাওয়ার আগে বেতন, থাকা-খাওয়া, কাজের সময় আর চুক্তির মেয়াদ লেখা কাগজ হাতে নিন — মৌখিক প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য নেই।
আরও সতর্কতা: বিদেশে চাকরির প্রতারণা চেনার উপায়।
২০২৫–২০২৬ সালের বড় পরিবর্তন
- স্কিল সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক (জুন ২০২৫ থেকে)। শুরু হয়েছিল প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, এসি টেকনিশিয়ান দিয়ে; এখন অনেক পেশা। প্রায় ২০% পরীক্ষার্থী ফেল করেছেন — তাই আগে থেকে কাজ শিখে যান।
- নতুন নিয়োগকর্তার কাছে ইকামা নবায়ন: আগস্ট ২০২৬-এ সৌদি উপমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন নতুন নিয়োগকর্তা আগের স্পন্সরের অনুমতি ছাড়াই বাংলাদেশি কর্মীর ইকামা নবায়ন করতে পারবেন।
- বাংলাদেশ-সৌদি নতুন নিয়োগ চুক্তি (অক্টোবর ২০২৫)। ২০৩০ এক্সপো আর ২০৩৪ বিশ্বকাপ ঘিরে আরও চাহিদার আশা।
কোন কাজে বেতন কত আর কোন পেশা সৌদিদের জন্য সংরক্ষিত — পড়ুন সৌদি আরবে বেতন ও চাকরির চাহিদা। খরচের হিসাব: সৌদি যেতে কত খরচ।
প্রশ্নোত্তর
সৌদির কাজের ভিসার জন্য কি দূতাবাসে ফি দিতে হয়?
সৌদি দূতাবাস জানিয়েছে, দূতাবাসে ভিসার আবেদনে কোনো ফি নেই। সৌদি আইনে রিক্রুটমেন্ট, ইকামা আর ওয়ার্ক পারমিটের খরচ নিয়োগকর্তার। তবে মেডিকেল, স্কিল টেস্ট ($৫০), পাসপোর্ট আর BMET-এর ফি কর্মীকে দিতে হয়।
Takamol স্কিল টেস্ট কি সবার লাগে?
গৃহকর্মী ছাড়া প্রায় সব কাজের ভিসায় লাগে — জুন ২০২৫ থেকে সার্টিফিকেট ছাড়া দূতাবাস ভিসা দেয় না। ফি $৫০, সার্টিফিকেট ৫ বছর বৈধ।
সৌদির ভিসা আসল কিনা কীভাবে বুঝব?
visa.mofa.gov.sa-তে ভিসা নম্বর দিয়ে যাচাই করুন — কোম্পানির নাম আর পেশা মিলিয়ে দেখুন। সন্দেহ হলে প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার ১৬১৩৫-এ ফোন করুন।
সৌদিতে পৌঁছানোর কতদিনের মধ্যে ইকামা হয়?
সাধারণত নিয়োগকর্তা ৯০ দিনের মধ্যে ইকামার কাজ করেন। ৯০ দিনের মধ্যে ইকামা বা ওয়ার্ক পারমিট না দিলে কর্মী নিয়োগকর্তার সম্মতি ছাড়াই চাকরি বদলাতে পারেন (শ্রম সংস্কার নিয়ম)।
তথ্যসূত্র
- সৌদি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (MHRSD) — শ্রম আইনের ৪০ ধারা: কোন খরচ নিয়োগকর্তার
- Arab News (২ জানুয়ারি ২০২৬) — ২০২৫ সালে সৌদিতে রেকর্ড সংখ্যক বাংলাদেশি
- টিবিএস (১ জানুয়ারি ২০২৬) — ২০২৫ সালের বিদেশে কর্মসংস্থান
- বণিক বার্তা (২ জুলাই ২০২৫) — স্কিল সার্টিফিকেট ছাড়া ভিসা নয়
- টিবিএস (১৫ অক্টোবর ২০২৫) — স্কিল ভেরিফিকেশন: পেশা ও ফেলের হার
- ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (অক্টোবর ২০২৩) — বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক, Tasheer কেন্দ্র
- টিবিএস (৮ মার্চ ২০২৫) — একক ভিসার সত্যায়ন
- টিবিএস বাংলা (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫) — মেডিকেল পরীক্ষার খরচ
- Gulf News (অক্টোবর ২০২৫) — Qiwa চুক্তি ও Najiz
- বাসস (৩০ জুন ২০২৬) — ওয়ার্ক পারমিট ঠিক করার সময়সীমা
- বাসস (৪ আগস্ট ২০২৬) — নতুন নিয়োগকর্তার কাছে ইকামা নবায়ন
নিয়ম ঘন ঘন বদলায় — বিশেষ করে সত্যায়ন আর স্কিল টেস্টের পেশার তালিকা। আবেদনের আগে BMET, oep.gov.bd বা প্রবাস বন্ধু ১৬১৩৫-এ নিশ্চিত হোন।
এই লেখার দেশগুলোর পূর্ণ গাইড — খরচ, ভিসা ও বেতন:
🇸🇦 সৌদি আরবকোন দেশে আপনার চাকরির সুযোগ সবচেয়ে বেশি?
শিক্ষা, অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা দিন — ২ মিনিটে দেখুন কোন দেশ, কোন ভিসা, কত বেতন। সম্পূর্ণ ফ্রি।
ফ্রি Analysis করুন →