প্রকাশ: · পড়তে ~৪ মিনিট
“সৌদি যেতে কত টাকা লাগে?” — এই প্রশ্নের উত্তরে দালালের মুখে ৫ লাখ থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত শোনা যায়। অথচ সরকারি হিসাবে সর্বোচ্চ খরচ এর অনেক কম, আর সৌদি আইনে বড় খরচগুলো নিয়োগকর্তার দেওয়ার কথা। নিচে তিনটা হিসাব পাশাপাশি — আইন কী বলে, সরকার কী বলে, আর বাস্তবে কী হয়।
সংক্ষেপে: সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ খরচ ৳১,৬৫,০০০ (২০১৬ সালে নির্ধারিত)। বিবিএস-আইএলও জরিপে বাস্তব গড় ৳৪,৩৬,৩৬৬ — ফেরত তুলতে ১৭ মাসের বেশি বেতন লাগে। সৌদি আইনে রিক্রুটমেন্ট ফি, ইকামা আর ওয়ার্ক পারমিটের খরচ নিয়োগকর্তার।
আইন কী বলে: কোন খরচ নিয়োগকর্তার
সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর ধারা অনুযায়ী নিয়োগকর্তা বহন করবেন:
- বিদেশি কর্মীর রিক্রুটমেন্ট ফি
- ইকামা (আবাসিক পরিচয়পত্র) ও ওয়ার্ক পারমিটের ফি এবং নবায়ন
- পেশা পরিবর্তন আর এক্সিট/রি-এন্ট্রির ফি
- চুক্তি শেষে দেশে ফেরার টিকিট
সৌদি দূতাবাসও জানিয়েছে, দূতাবাসে ভিসার আবেদন করতে কোনো ফি লাগে না। অর্থাৎ “ভিসার দাম” বলে যে বড় অঙ্ক চাওয়া হয়, তার বেশিরভাগ আসলে মধ্যস্বত্বভোগীর লাভ।
সরকারের সর্বোচ্চ সীমা: ৳১,৬৫,০০০
২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবে যাওয়ার সর্বোচ্চ খরচ ৳১,৬৫,০০০ নির্ধারণ করে। ডিসেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদনেও এই অঙ্কই উল্লেখ আছে — এরপর সংশোধনের কোনো ঘোষণা আমরা পাইনি। এর বেশি চাওয়া মানে নির্ধারিত সীমার বাইরে টাকা নেওয়া।
বাস্তবে কত লাগে
| উৎস | গড় খরচ |
|---|---|
| সরকারি সর্বোচ্চ সীমা (২০১৬) | ৳১,৬৫,০০০ |
| বিবিএস-আইএলও খরচ জরিপ (২০২০) | ৳৪,৩৬,৩৬৬ |
| সাক্ষাৎকার ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (পুরুষ কর্মী) | ৳৫–৯ লাখ |
একই জরিপ বলছে, খরচের প্রায় ৭৮% যায় দালাল আর সাব-এজেন্টের হাতে। আর এই টাকা তুলতে একজন কর্মীর ১৭ মাসের বেশি বেতন লেগে যায় — অর্থাৎ প্রথম দেড় বছর কার্যত ঋণ শোধে যায়।
অনিবার্য খরচ — যেগুলো আপনাকেই দিতে হবে
| খাত | টাকা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| পাসপোর্ট (ই-পাসপোর্ট, ৪৮ পৃষ্ঠা, সাধারণ) | ৳৪,০২৫ (৫ বছর) / ৳৫,৭৫০ (১০ বছর) | আগে থেকে থাকলে লাগবে না |
| মেডিকেল পরীক্ষা | প্রায় ৳১০,০০০ + Wafid $১০ | সরকার-নির্ধারিত; বাস্তবে ৳১৭–২০ হাজার নেওয়ার অভিযোগ আছে |
| স্কিল টেস্ট (Takamol) | $৫০ (~৳৬,০০০) | ফেল করলে আবার $৫০ |
| BMET/OEP নিবন্ধন | ৳২০০ | অনলাইনে |
| কল্যাণ ফি | ৳৫,৫০০ | ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে (আগে ৳৩,৫০০) |
| বিমা | ৳১,০০০ | কল্যাণ ফির সাথে |
| স্মার্ট কার্ড | বিনামূল্যে | ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে |
এগুলো যোগ করলে (পাসপোর্টসহ) মোটামুটি ৳২৭–৩০ হাজার। বিমান টিকিট আর এজেন্সির সার্ভিস চার্জ এর বাইরে — সেগুলোও সরকারি ১.৬৫ লাখের সীমার ভেতরে থাকার কথা।
ফিট রিপোর্ট “নিশ্চিত” করার জন্য ৳৩০–৮০ হাজার ঘুষ নেওয়ার খবর এসেছে। মেডিকেলে আনফিট হলে সেটা আপনার স্বাস্থ্যের প্রশ্ন — টাকা দিয়ে রিপোর্ট বানালে সৌদিতে পৌঁছে আবার পরীক্ষায় ধরা পড়ে দেশে ফেরত আসার ঝুঁকি থাকে।
খরচ কমানোর ৬টি উপায়
- শুধু লাইসেন্সধারী এজেন্সি: OEP-এর RAIMS তালিকায় লাইসেন্স “Active” কিনা দেখুন। গ্রামের দালালের হাত ঘুরে গেলে প্রতিটা হাতে খরচ বাড়ে।
- রসিদ নিন: প্রতিটা লেনদেনের লিখিত রসিদ — কাকে, কত, কী জন্য। সম্ভব হলে ব্যাংকে টাকা দিন।
- লিখিত চুক্তি: বেতন, থাকা-খাওয়া, মেয়াদ আর কে কোন খরচ দেবে — সব লেখা থাকতে হবে।
- দক্ষতা নিয়ে যান: স্কিল সার্টিফিকেট এখন বাধ্যতামূলক। TTC-তে কম খরচে প্রশিক্ষণ নিলে একবারে পাস করবেন, আর দক্ষ কর্মীর বেতনও বেশি।
- ঋণ নিলে সরকারি ব্যাংক: প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অভিবাসন ঋণ দেয় — ২০২৩–২৪ সালের শর্তে ৳৩ লাখ পর্যন্ত, ৯% সরল সুদে, জামানত ছাড়া (দুজন জামিনদার লাগে)। সর্বশেষ শর্ত ব্যাংকে জেনে নিন। চড়া সুদের মহাজনি ঋণ এড়িয়ে চলুন।
- অভিযোগ করুন: বেশি টাকা নিলে বা প্রতারণা হলে BMET-এ অভিযোগ করা যায়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এর অধীনে ক্ষতিপূরণ মামলাও করা যায়।
একটা সাধারণ হিসাব মাথায় রাখুন: আপনার মাসিক বেতন যদি SAR ১,২০০ (প্রায় ৳৩৯,০০০) হয় আর খরচ ৳৫ লাখ, তাহলে থাকা-খাওয়ার পর মাসে ৳২৫–৩০ হাজার পাঠাতে পারলেও শুধু খরচ তুলতে ১৬–২০ মাস লাগবে। বেতন কত পাবেন তা আগে নিশ্চিত করুন — সৌদি আরবে বেতন ও চাকরির চাহিদা।
প্রশ্নোত্তর
সৌদি যেতে সরকারি খরচ কত?
সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ খরচ ৳১,৬৫,০০০ (২০১৬ সালে নির্ধারিত)। এর মধ্যে এজেন্সির সার্ভিস চার্জ, টিকিটসহ সব থাকার কথা।
সৌদি ভিসার দাম কত?
সৌদি দূতাবাস বলছে দূতাবাসে ভিসার আবেদন বিনামূল্যে, আর সৌদি আইনে রিক্রুটমেন্ট ফি নিয়োগকর্তার। “ভিসা কেনা” বলে যে টাকা চাওয়া হয়, সেটা সাধারণত মধ্যস্বত্বভোগীর।
সৌদি যাওয়ার জন্য লোন কোথায় পাব?
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক জামানত ছাড়া অভিবাসন ঋণ দেয় (২০২৩–২৪ সালের শর্তে ৳৩ লাখ পর্যন্ত, ৯% সুদ)। আবেদনের আগে ব্যাংকের শাখায় সর্বশেষ শর্ত জেনে নিন।
মেডিকেল পরীক্ষায় কত টাকা লাগে?
সরকার-নির্ধারিত খরচ প্রায় ৳১০,০০০, সাথে Wafid-এর $১০ রেজিস্ট্রেশন।
তথ্যসূত্র
- MHRSD — সৌদি শ্রম আইনের ৪০ ধারা
- জাগো নিউজ (৩০ আগস্ট ২০১৬) — সৌদি যেতে সর্বোচ্চ খরচ ৳১,৬৫,০০০
- ঢাকা ট্রিবিউন (২০ ডিসেম্বর ২০২৫) — জরিপের গড় খরচ ও বাস্তব চিত্র
- টিবিএস (আগস্ট ২০২২) — দূতাবাসে ভিসা ফি নেই
- বিডিনিউজ২৪ — ই-পাসপোর্ট ফি
- টিবিএস বাংলা (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫) — মেডিকেল খরচ ও অনিয়ম
- টিবিএস (৫ জুলাই ২০২৫) — স্কিল টেস্ট ফি $৫০
- বিডিনিউজ২৪ (২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) — কল্যাণ ফি ৳৫,৫০০ ও বিমা
- প্রথম আলো (২৯ জুলাই ২০২৪) — প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অভিবাসন ঋণ
খরচ আর ফি বদলাতে পারে। সরকারি সর্বোচ্চ সীমা ২০১৬ সালের — নতুন কোনো সীমা ঘোষণা হয়েছে কিনা BMET বা ১৬১৩৫-এ জেনে নিন।
এই লেখার দেশগুলোর পূর্ণ গাইড — খরচ, ভিসা ও বেতন:
🇸🇦 সৌদি আরবকোন দেশে আপনার চাকরির সুযোগ সবচেয়ে বেশি?
শিক্ষা, অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা দিন — ২ মিনিটে দেখুন কোন দেশ, কোন ভিসা, কত বেতন। সম্পূর্ণ ফ্রি।
ফ্রি Analysis করুন →